অমলকান্তি

    নীলোৎপল মন্ডল

খালি পা, হাফ প‍্যান্ট, গায়ে একটা আধময়লা গেঞ্জি, অমলকান্তি ঘুড়ি নিয়ে ছুটছে আলপথ দিয়ে। মাস্টার মশাই সাইকেল থেকেই জিঞ্জেস করলো
আজ স্কুলে যাবিনা অমল ?
ছুটতে ছুটতেই অমলের প্রত‍্যুত্তর , আজ নদীর ধারে বড় ডাঙায় ঘুড়ি কাটাকাটির খেলা আছে স‍্যার , মায়ের জ্বর তাই আজ যেতে পারবো না, বাবা কাজে গেছে আর বাড়িতে মা একা, একটু পরেই আমি বাড়ি চলে আসবো।
গোপালগঞ্জ গ্ৰামটিতে জনা পঞ্চাশ পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর। সকাল হলেই গ্ৰামে পুরুষ মানুষ এর সংখ্যাটা একদম কমে যায়, নদীর ওপারে যে মফস্বল শহর রয়েছে সেখানেই সবাই কাজ করতে যায় আবার সন্ধ্যা হলেই সবাই গ্ৰামে ফেরে , এই তাদের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রা।
ছোট্ট একটা একচালার বাড়ীতে গ্ৰামের স্কুল বসে, জনা চল্লিশেক বাচ্চা সেখানে পড়তে আসে। মফিজুল স‍্যার আজ প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এখানের মাস্টার মশাই, বছর কয়েক আগে শহর থেকে একজন দিদিমণি এসেছিলেন আর কিছুদিন পরেই বদলি নিয়ে চলে গেলেন।
রোজকার মতো আজও মফিজুল বাবু নিজের কাঠের চেয়ারে বসে টেবিলটিকে সামনে নিয়ে নস‍্যি টা নাক দিয়ে টানলেন।
– কিরে তপন তুই ঘুড়ি কাটাকাটির খেলায় যাসনি!        অমলকে তো দেখলাম দৌড়াতে দৌড়াতে গেল।
– না স‍্যার মা বকে খুব, আগের বছর মারাত্মক রকম ঝামেলা হয়েছিল, পাসের গাঁয়ের ছেলেগুলো ঝামেলা করে অহেতুক মারামারি করেছিল।
স্কুলের পড়া যথারীতি চলছে। বয়স হয়েছে মাস্টারের, তাই মাঝে মাঝেই পড়াতে পড়াতে ঘুমিয়ে পড়ে, ছেলেদের চিৎকারে আবার উঠে নস‍্যি নেয় আর বলতে থাকে  , বল জোরে জোরে নামতা বল দেখি।
ছেলেরা সুর করে নামতা পড়তে থাকে,
দুই দু’গুনে চার , তিন দু’গুনে ছয় …
দুপুর তখন বারোটা। অমল নামতার সুর শুনতে শুনতে স্কুলের পাশ দিয়ে পার হয়ে গেল।
পড়াশোনা তার খুব একটা ভালো লাগে না। নদীর পাড় , পাটের খেত এগুলো তেই তার সময় কাটে বেশি।
নদীর পাড়ে বসে বসে পাখিদের উড়ে যাওয়া ভালো লাগে, মাঝির ভাটিয়ালি একমনে শুনতে থাকে ও, হারিয়ে যায় সেই সুরে। দিনশেষের সূর্যের আলো যখন নদীর চরে পড়তে থাকে সেই সোনালী আলোয় অমল তখন পাখীদের নীড়ে ফেরা দেখে, তাদের কলতান মুগ্ধ করে অমলকে।
শেষ খেয়ায় বাবা যখন শহর থেকে ফেরে তখন অমলকেও সঙ্গে করে নিয়ে ফেরে। মাথায় ঘোমটা নিয়ে মায়ের তুলসী তলায় শাঁখের আওয়াজ একপ্রকার মুগ্ধতা দেয় অমলকে। হ‍্যারিকেন এর আলোয় মাদুরের ওপর পড়তে বসে ঘুম পায় অমলের, মায়ের বকুনি খেয়ে ধীরে ধীরে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে বছর আটেকের অমল।
আজ বারোই মে, আর কয়েকদিন পর স্কুলে গরমের ছুটি পড়বে। মাস্টার মশাই শ্রেনীতে এসে সে কথাই বলতে শুরু করেছে। এমন সময়
” আসবো স‍্যার” ?
আওয়াজটা খুব চেনা মাস্টারের।
– কিরে অমল এতোদিন কোথায় ছিলি!
স্কুলে আসিসনি প্রায় একসপ্তাহ হলো, কি ব‍্যাপার তোর ?
– মা’ আর নেই স‍্যার।
শীর্ণকায় একটি চেহারা, রুগ্ন, বুকের পাঁজরগুলো গেঞ্জির ওপর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। উস্কোখুস্কো চুল, পা দিয়ে পা ঘসতে ঘসতে অমল একরাশ বিষন্নতা নিয়ে মাস্টারকে কথাটা বললো।
দশ দিনের জ্বরে মা মারা গেল স‍্যার, শহরের ডাক্তার এর কাছেও নিয়ে গেছিল বাবা তবুও সারলো না।
এখানে আমাকে দেখার তো কেউ নেই তাই বাবা বললো আমাকে শহরে নিয়ে যাবে, ওখানে বাবার সাথে মিলে কাজ করবো আর বাবার সাথেই থাকবো।
আপনার সাথে তাই দেখা করতে এলাম স‍্যার, কি জানি আর কবে দেখা হবে।
আবেগ সামলাতে পারলেন না মফিজুল বাবু, বুকে টেনে নিয়ে আদর করলো অমলকে।
অমলের চোখে তখন জল।
শহরের যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় মানিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে অমলের। পাটের ক্ষেত নেই, আলপথ বেয়ে ঘুড়ি ওড়ানো নেই, নদীর চর নেই, নৌকা- মাঝি – ভাটিয়ালি কিমবা পাখিদের নীড়ে ফেরা নেই। স্কুলের শিক্ষক মশাই খেলার সাথী কিছুই নেই।  সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে তুলসী তলায় যাওয়াও নেই।
শুধুই গাড়ির হর্ন , কলকারখানার ঘড়র ঘড়র শব্দ, আর ব‍্যস্ত মানুষের যাতায়াত।
অমল যেন কেমন একটা মনমরা হয়ে পড়েছে ইদানিং। সবকিছুই যেন তার বিষন্নতার কারন হয়ে উঠেছে। হঠাৎ খুব জ্বর হয় অমলের, তারপর…
অমলকান্তি যে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।
.
১০ ই পৌষ। পুরুলিয়া।
.
( প্রিয় কবি নীরেন্দ্রনাথের প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ‍্য )
.
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: