অন্তরহস্য – সাজ্জাদ আলম

সন্ধ্যে ০৬টা বেজে ৩৫মিনিট, টিউশনি থেকে ফিরল সোহম,সাইকেলটায় স্ট্যান্ড দিয়ে,ব্যাগপত্তর সব এদিক সেদিক ছুঁড়ে দিয়ে,ছুটে চলে গেল বারান্দায় দাদুর কাছে.

সোহম দেখে দাদু আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসে আছেন, চশমাটা বুকের ওপর রাখা, চেয়ারটা হাওয়ায় দুলছে.

– দাদু,দাদু! গল্প শোনাবে না?

-(চোখ বন্ধ করেই) হ্যাঁ শোনাবো তো, কিন্তু এখন তুমি যাও হাত মুখ ধুয়ে একটু জলখাবার খেয়ে পড়তে বসো, তারপর তোমায় একটা গল্প শোনাবো.

-আচ্ছা দাদু(দৌড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল)

সোহমের দাদু শ্রীযুক্ত বঙ্কিমনাথ বাবু ছিলেন একজন পর্বতারোহী, তিনি সোহমকে প্রত্যেক দিন একটা করে গল্প,কবিতা, পর্বত অভিযানের কাহিনী শোনাতেন.

রাত ০৯টা বেজে ৪৫

-দাদু,দাদু!গল্প শোনাবে না?

-এসো সোনাই এসো, তোমায় আজ এক নতুন গল্প শোনাবো. সোহমকে কোলে বসিয়ে গল্প শুরু করলেন বঙ্কিম বাবু

– দিনটা ছিল ২১শে ডিসেম্বর, প্রচন্ড শীত পরেছে, চারদিকে কুয়াশার একটা চাদরে মুড়ে গেছে গোটা শহর, আমরা তখন কাঠমান্ডুতে, উদ্দেশ্য ছিল এভারেস্ট,

এই প্রচন্ড কুয়াশা আর পর্বতের বিশাল ভয়ঙ্কর তুষার ঝড়ে এখন উপরে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না সেই নিয়ে আলোচনা বসেছে,

ক্যাপ্টেন জন ইংরাজি মেশানো বাংলায় বললেন “কিসু হবে না, আমাদের এখুনি যাওয়া উচিত, আমরা এর থেকেও বড় বড় ঝড়ের মুকাবিলা করেছি তো…”.

কথাটা ভুল বলেননি ক্যাপ্টেন, সত্যিই আমরা এর আগে অনেক বড় বড় ঝড়ের মোকাবিলা করেছি.আমরা রওনা দিলাম. আগে আগে ক্যাপ্টেন পিজনে আমরা বরফ কেটে এগিয়ে যাচ্ছি. দিন না রাত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না,

আকাশ টা তখন একটু হলেও পরিস্কার ছিল, হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল, কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না, আকাশে ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা যাচ্ছে. আমি আমার সঙ্গীদের ডাক দিলাম,

কোনো উত্তর পেলাম না, একটা আওয়াজ শোনা গেল “বঙ্কিম উপরে এগিয়ে এসো”, দেখতে না পেলেও স্বর চিনতে পারলাম, ক্যাপ্টেন জন,

“বাকিরা কোথায়?”, “ওরা সবাই নীচে আছে তুমি তাতাড়ি উপরে আসো”. আমি এগিয়ে গেলাম.

আকাশ একটু পরিস্কার হয়েছে, কদিন এখানে ছিলাম জানা নেই, আবার রওনা দিলাম, আমি আগে ক্যাপ্টেন পেছনে. মনটা তখন আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল যখন গন্তব্যস্থল টা একটু দুরেই দেখতে পেয়েছিলাম. ভেবেছিলাম প্রথম বাঙালী এভারেস্ট জয়ীর খেতাব পাবো,

আরো কত কিছু. ক্যাপ্টেন জন বললেন “বঙ্কিম, আমাকে উপরে তোলো, আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি, তুমি আমাকে তুলে দাও তারপর আমি তোমার হাতটা ধরে উপরে টেনে নেবো”. আমি আমার ব্যাগে হাতটা বুলিয়ে নিলাম,

কিছুক্ষণ পরেই সে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এভারেস্টের মাথা নত করে তার মাথা উঁচু করে গগনচুম্বী হবে. হাতটা টেনে উপরে তুললাম ক্যাপ্টেনকে, আমি হাতটা বাড়ালাম, ক্যাপ্টেন টানো আমায়,

কিন্তু ক্যাপ্টেন টানলেন না, বললেন ”sorry বঙ্কিম, আমি পেপারে আমার নামের পাশে তোমার মতো কোনো বাঙালীর নাম দেখতে চাই না”. হাতটা ছেড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন.

  হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল সোহমের, সকাল ০৮টা ৩০ , স্কুল যেতে হবে, বাইরে বেরিয়ে আসে সোহম, আরামকেদারাটা এখনও হাওয়ায় দুলছে,

পাশে রাখা খবরের কাগজের হেডলাইন “বিশাল তুষারঝড়ে নিখোঁজ ১৬জন পর্বতারোহী”, কিছু দেখল না সোহম, আরামকেদারাটায় হেলান দিয়ে বসল, চশমাটা বুকের উপর রাখল,চোখ বন্ধ করে শুধু বলল “দাদু,দাদু!গল্প শোনাবে না ?”

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *