অণুগল্প 

ঘুঁটে পোড়ে  //  সুদীপ ঘোষাল

 

একবার তোর ছেলে নরেনের কথা ভাবলি না। দেহের খিদে মেটাবার জন্য বছর না ঘুরতেই আবার বিয়ে করলি। বন্ধুকে, রমেন বললো।
—- কি করবো বল।  সমাজে নোংরামি করতে আমার ভালো লাগে না।  মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি প্রশমন তো করতে হবে।  নকল সাধু হয়ে লোক ঠকাতে পারবো না। তাই আবার বিয়ে করলাম।
—- ভালো করেছো।  এবার সৎমার অত্যাচারে ছেলেটা ভু গবে।শুধু বাতেলা।  কালকে তোকে হাড়কাটা  গলিতে দেখলাম।  বিয়ে করেছিস তবু স্বভাব গেলো না।
—- এই একটু আস্তে কথা বল।  বৌ শুনতে পাবে।
— ছি ছি ছি

 এই কথা বলে রমেন বেরিয়ে গেলো।

ছেলে নরেন কলেজ থেকে এসে বললো,বাবা পাঁচ হাজার টাকা লাগবে।  আমি কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হবো।
বাবা চুপ করে আছে।  সৎমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, একটা টাকাও পাবি না। আমাদের ভবিষ্যৎ আছে।তোকে আর পড়তে হবে না। নিজেরটা নিজে দেখে নে। তোর খাবার জোগাড় করতে পারবো না।  যা বেরো এখান থেকে। মরেও না আপদ।তারপর স্বামীর সামনেই অকথ্য গালাগালি শুরু করলো। স্বামী আসামির মতো চুপসে গেলো ভার্যার ভয়ে।
ছেলে বাবাকে আবার বললো তার স্বপ্নের কথা।
বাবা সমস্ত কথা শুনলো।উত্তর নেই। দ্বিতীয় ভার্যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে অযোগ্য বাবা। বাবা চুপ করে মাথা নিচু করে রইলো। নরেন বেরিয়ে গেলে সৎমা বললো, বুঝলে বাঁচলাম আমরা। পরের ছেলে থাকলেই ঝামেলা।

নরেন ঠিক করলো সে তার মৃত মায়ের কাছে যাবে। অপমানে তার বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেলো। সৎমার এই অপমান সে সহ্য করতে পারলো না। অন্ধকার তার মন অধিকার করে নিলো নিমেষে। আশা হেরে গেলো বিষাদের কাছে।
সে মেঘ হয়ে গেলো মায়ের খোঁজে।

খবরটা ছড়াতে সময় বেশি লাগলো না।অসতীর কানে খবরটা গেলো।  তার বদনে তখন গোপন গর্বে গোবরের হাসি…

.

পুজোয় প্রথম প্রেম   //     সুদীপ ঘোষাল

নবমি নিশিতে ধুনুচি নাচ চলছিলো দুর্গামন্ডপে।রিতা নাচের ফাঁকে দেখে নিলো তপুর  চোখ।নিস্পলক দৃষ্টি তপুর চোখে।গিলছিলো রিতার নাচের ভঙ্গিমা।তারপর তপু গিয়ে একটা ঢাক বাজাতে শুরু করলো।কখন যে    রিতার নাচ শেষ হলো তপু জানতেই পারলো না। তখন নাচ শুরু করেছে পাড়ার ক্যাবা মস্তান।

ঢাকের তাল কাটতেই তপুর কপালে জুটলো তিরস্কার। রিতার তখন দারুণ হাসি।তার বান্ধবীরাও হাসছে। তপু বাজানো বন্ধ করে পাশে দাঁড়ালো।সে মনে মনে ভাবলো, অসুরের মত দেখতে ছেলেগুলো কেন মেয়েদের এত প্রিয় হয়।পাশে আমি ছিলাম।

বললাম, পাগলা পুজো শেষ হয়ে যাবে। যা বলার এখনি বলে দে রিতাকে।নইলে পরে পস্তাতে হবে। তপু ঢাকের কাঠি দুটো নিয়ে গিয়ে রিতাকে বললো,তুমি আর একবার নাচো না প্লিজ। সঙ্গে সঙ্গে আবার হাসি। তারপর থেকে লজ্জায় প্যান্ডেল ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলো।জানিনা কবে যে তপু সাবালক হবে।

.

মা   // সুদীপ ঘোষাল

আজীবন ছেলেদের ভালোমন্দে মিশে গিয়েছিলো তার জীবনের সমস্ত সখ, আহ্লাদ।কোনোদিন নিজের জন্য চিন্তা করে নি মাতৃহৃদয়। ছেলেদের মঙ্গলচিন্তায় ভেসে গিয়েছিলো মায়ের জীবন।

আজ বৃদ্ধা মা এক অন্ধকার ঘরে একা। ছেলেরা ব্যস্ত। ফালতু কাজে তারা সময় নষ্ট করে না। সংসার,আর ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তারা চিন্তিত।মায়ের দেখাশোনা,সঠিক সময়ে খেতে দেওয়া কিছুই তাদের মনে থাকে না।

 মায়ের তবু কোনো অভিযোগ নেই। ছেলেরা ভালো থাকলেই হলো। কষ্টের কম্পাঙ্ক পেরিয়ে যায় মায়ের ভালোবাসা চির সজীব…

.

কবি  //  সুদীপ ঘোষাল

যে ছেলেটা পূর্ণিমা পুকুরের জ্যোৎস্না ভিজে চাঁদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতো সে চাঁদ ছুঁতে পারেনি।সমস্ত যোগ্যতার ফানুস সে উড়িয়ে দিয়েছিলো ঘাসের শিশিরে,বাতসের খেলায়।হেলায় সে হয়েছিলো ফাঁকা

মাঠের রাজা।আলপথের মাটির গন্ধে তার যোগ্য সম্মানের ঘ্রাণ নিতো প্রাণভরে।সমস্ত চাওয়া পাওয়ার বাইরে অনুভূতির জগতে তার আসা যাওয়া।বন্ধু বলতো,তোর ধনী হতে ইচ্ছে হয় না?ছেলেটি উত্তর দিলো না।

সে জানে তার আপন জগতে সে শুধু রাজা নয়, সম্রাট।তাই সে অবহেলায় যাপন করতো সাধারণ জীবন।সে জানে তার মত ধনী কমই আছে।বাতাসের রেণু,আকাশের হৃদয় আর সবুজের হাতছানিতে সে ছুটে চলে যেতো।সেখানে গিয়ে সে কথা বলতো আপন মগ্নতায়।

তার কথাগুলো হয়ে যেতো কবিতার পান্ডুলিপি…

.
ঝড়   //  সুদীপ ঘোষাল

 

কই গো ওখানে কি করছো । একবার এখানে এসো ।
যাই, কি হলো কি?
আর কি হবে,বাবাই এর অঙ্ক টা দেখো

বাবাই এর খাতাটা দেখতে দেখতে বাবু চলে গেলো অতীতে ।একবার বেলুন গ্রামে পিসীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বাবু এক বিপদে পড়েছিলো ।সবাই খেতে বসেছে, এমন সময়ে একটা সাপ হঠাৎ বাবুর পায়ে ছোবল দিয়ে পালিয়ে গেলো ।

মহাচিন্তায় বাবু হাসপাতাল যাওয়ার জন্য একটা টোটো ভাড়া করে রওনা হলো। পথে দেখলো একটা বয়্স্ক লোক দুর্ঘটনায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ।বাবু লোক টি কে কোলে করে তুলে নিলো । বিপদ একা আসে না । হাসপাতাল যাওয়ার পরে দুদিন পরে দুজনেই সুস্থ হলেন ।মানুষের জীবনে কত ঝড় যে আসে ।

বাবা কি করছো খাতাটা দাও
ছেলের ডাকে বাবুর চিন্তার রেশ কেটে গেলো ।

.

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *